শিখতে পারি অনেক কিছু পিঁপড়া থেকে

419

Ant-Traffic

পিঁপড়া খুবই ছোট একটি পতঙ্গ। সাধারণত একেকটি পিঁপড়ার ওজন হয় ২ থেকে ৫ মিলি গ্রাম। অন্যদিকে পূর্ণ বয়ষ্ক মানুষের গড় ওজন ৬২ কেজি। এ হিসেবে একজন মানুষ একটি পিঁপড়া থেকে প্রায় সোয়া এক কোটি গুণ বড়। অন্যভাবে বলা যায়, মানুষের চেয়ে পিঁপড়া সোয়া এক কোটি গুণ ছোটো। এসব কারণে আমরা সাধারণ মানুষ পিঁপড়াকে খুবই তুচ্ছ ভাবি। কিন্তু তোমরা জেনে অবাক হবে, ক্ষুদ্র এই পতঙ্গ তথা পিঁপড়া নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের শেষ নেই।

বিজ্ঞানীরা পিঁপড়া নিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা করছেন। আর ওই গবেষণার ফল দেখে নিজেরাই চমকে উঠছেন। এদের মধ্যে এমন সব গুণাবলী আছে, যা মানুষের মধ্যেও বিরল। সব মানুষের মধ্যে এসব গুণাবলী থাকলে থাকলে মানবসমাজের চিত্রটা হতে পারতো ভিন্ন।

পিঁপড়ারা সামাজিক

পিঁপড়ারা খুবই সামাজিক। এরা সমাজবদ্ধভাবে বাস করতে পছন্দ করে। তাই তারা মহল্লা বা দল তৈরি করে। এদের এই রকম দলকে বলে কলোনি। কয়েক হাজার থেকে শুরু করে কোটিখানেক পিঁপড়াও থাকতে পারে একটি কলোনিতে। প্রত্যেক প্রজাতিতে তিন ধরনের পিঁপড়া থাকে। রানী পিঁপড়া, স্ত্রী পিঁপড়া এবং পুরুষ পিঁপড়া। প্রত্যেকের কাজ ও দায়িত্ব ভাগ করা। কোনো শাসন বা মনিটরিং ছাড়াই নিজ দায়িত্বে প্রত্যেকের কাজটি করে যায়।

দলীয় নৈপুণ্য

পিঁপড়ারা সংগঠিতভাবে থাকে। তারা দলীয় নৈপুণ্যের উপর অনেক বেশী নির্ভর করে। তাই কয়েকটি মাত্র পিঁপড়া অনেক সময় তাদের দেহের কয়েকশ গুণ ওজনের খাদ্য বহন করে নিয়ে যায়। যদি কোনো পিঁপড়া দেখে, খাদ্য কণাটি (অন্য বস্তুও হতে পারে) নিয়ে তাদের কষ্ট হচ্ছে, তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে সে বস্তুটি বহন করার কাজে লেগে পড়ে।

ants-carrying-food
কয়েকটি পিঁপড়া একটি মৃত ফড়িং এর দেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের কলোনিতে

লেগে থাকার মানসিকতা

পিঁপড়ার দল কোনো কাজ শুরু করলে সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়ে না। কাজটি শেষ করা (প্রধানত খাদ্য সংগ্রহ ও বহন) কঠিন মনে হলে কলোনি থেকে অসংখ্য পিঁপড়া সহায়তা করার জন্য বের হয়ে আসে। খাদ্য কলোনিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের কাজ বন্ধ হয় না।

সঞ্চয়ী স্বভাব

পিঁপড়ারা যথেষ্ট সঞ্চয়ী স্বভাবের। এরা দুর্দিনের কথা ভেবে কলোনিতে যতটা সম্ভব বাড়তি খাদ্যের মজুদ গড়ে তুলে। তাই বর্ষা মৌসুমে বা খারাপ সময়ে এদেরকে খাদ্য সঙ্কটে পড়তে হয় না।

ট্রাফিক সেন্স

পিঁপড়াদের ট্রাফিক ব্যবস্থা অনুকরণীয়। এরা এমনভাবে চলাচল করে যাতে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ না হয়, গতি থমকে না যায়। খাদ্যের সন্ধান পাওয়া গেলে কলোনি থেকে বেশি সংখ্যক পিঁপড়া খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ছোটে। কিন্তু তাতেও চলাচলের গতি ব্যাহত হয় না। বরং এই গতি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাদের নিজস্ব ট্রাফিক সিস্টেমের কারণেই এটি সম্ভব। এই সিস্টেম স্বতস্ফূর্তভাবে সব পিঁপড়া মেনে চলে। সাধারণত খাদ্য নিয়ে ফেরার সময় পিঁপড়ারা বাম দিকের লেন ধরে চলে। ডান দিকের লেনে চলাচল করে খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বের হওয়া পিঁপড়েরা। অনেক বেশি সংখ্যক পিঁপড়ার চলাচল করতে হলে তারা তিনটা লেন করে নেয়। মাঝখানের লেনটি থাকে খাদ্য নিয়ে কলোনির দিকে ফিরে আসতে থাকা পিঁপড়াদের জন্য। বাকী লেন দুটি কলোনি থেকে খাদ্য সংগ্রহে বের হওয়া পিঁড়াদের জন্য।

অনেক সময় পিঁপড়ারা নিজেদের শরীর দিয়ে অন্য পিঁপড়াদের চলাচলের জন্য জীবন্ত সেতু (Live Bridge) বানায়। চলাচলের ক্ষেত্রে কোথাও গর্তের মতো বা ফাঁকা জায়গা থাকলে তারা এই সেতু বানানোর চেষ্টা করে। একবার সেতুটি বানিয়ে ফেলতে পারলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটির আকার পরিবর্তন করে নেয়। কারো কোনো নির্দেশ ছাড়াই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সেতু তৈরি করতে পারে। যখন তারা বুঝতে পারে প্রয়োজনীয়তা প্রায় শেষ তখন তারা ওই সেতু ভেঙ্গে ফেলে।

 

প্রতিকূলতা মোকাবেলায় দলীয় চেষ্টা

অনুকূল সময়ের মতো প্রতিকূল বা খারাপ পরিস্থিতিতেও পিঁপড়ারা দলীয়ভাবে ঐকবদ্ধ থাকে। এটি স্পস্টভাবে ধরা পড়ে বর্ষকালে বা বন্যার সময়।

Ant-raft
পানিতে নিজেদের শরীরের ভেলা বানিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পিঁপড়ারা

অনেক সময় বৃষ্টির পানি বা বন্যার জলে পিঁপড়াদের কলোনি ভেসে যায়। এমন পরিস্থিতে একা বেঁচে থাকার চেষ্টা না করে দলীয়ভাবে সবাই মিলে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এটি পিঁড়ার দেহের উপর আরেকটি পিঁপড়া উঠে, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে এরা এক ধরনের ভেলা বানায়। আর এই ভেলা ভাসতে থাকে পানিতে।

 

মন্তব্য