নজরুলের শৈশব ও কৈশোর

49

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের খড়ের ছাওয়া এক মাটির ঘরে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহন করেন। সেই মাটির ঘরের পূর্বদিকে রাজা নরোত্তমের গড়, দক্ষিণে পীর পুকুর, পুকুরের পূর্ব পাড়ে হাজি পালোয়ানের মাজার, পশ্চিম পাড়ে মসজিদ। নজরুলের বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। ১৯০৮ সালে নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমদ মারা যান। তখন নজরুলের বয়স মাত্র নয় বছর। দশ বছর বয়সে নজরুল গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর গ্রামের মক্তবের শিক্ষকতা, হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেম এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজে নিযুক্ত হন। মূলত পিতার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য নজরুলকে এসব দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল।

Kabi-Nazrul

নজরুলের চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন ওই অঞ্চলের লেটো দলের একজন নামকরা ব্যক্তি। তাঁর আরবী, ফারসী ও উর্দু ভাষায় অগাধ জ্ঞান ছিল। যাঁর কাছ থেকে নজরুল সঠিক ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন । এছাড়াও কাজী বজলে করিম মিশ্রভাষায় কবিতা ও গান রচনা করতেন। চাচার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে লেটো দল নজরুলকে আকর্ষণ করেছিল। নজরুলের কবি ও সংঙ্গীতজ্ঞ জীবনের শুরু ওই লেটো দল থেকেই। লেটোদলের জন্য পালা গান রচনা করতে গিয়েই হিন্দু পুরাণের সঙ্গেও নজরুলের পরিচয় ঘটেছিল। লেটো দলের কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি চাষার সঙ্, শকুনি বধ, রাজা যুধিষ্ঠরের সঙ্, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ্, কবি কালিদাস, বিদ্যাভুতম, রাজপুত্রের সঙ্, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ , মেঘনাদ বধ প্রভৃতি।

লেটো দলের পর ১৯১০ সালে নজরুল পুনরায় ছাত্র জীবনে ফিরে আসেন। জনশ্রুতি হল, নজরুলের পাড়াপড়শিরা তাঁকে প্রথমে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি করে দেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ঐ স্কুল ছেড়ে নজরুল মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল বা নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে ষষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হন। তখন ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। তিনি তাঁর ছাত্র সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে- “ছোট সুন্দর ছেলেটি, আমি ক্লাস পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত। আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম। সে বড় লাজুক ছিলো।” কিন্তু আর্থিক কারণে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর ছাত্র জীবনে আবার বিঘ্ন ঘটে। মাথরুন স্কুল ছেড়ে তিনি সম্ভবত: প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে যোগদেন। তারপর বর্ধমান-অন্ডাল ব্রাঞ্চ রেলওয়ের এক খ্রিষ্টান গার্ড সাহেবের খানসামার এবং শেষে আসানসোলের এক বেকারি ও চা-এর দোকানে চাকুরি নেন। এভাবে দারিদ্র্যের কারণেই স্কুলের পড়াশুনা ত্যাগ, গার্ডের বয় বিয়ারার, আসানসোলের বেকারি ও গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে চায়ের দোকানের কিশোর শ্রমিক নজরুল কৈশোরেই জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হন। এজন্য তাঁর অপর নাম দুঃখু মিঞা।

পরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এগোয় তার জীবন। অভাব-অনটন, ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পরিণত মানুষ হন তিনি। হয়ে উঠেন দেশসেরা কবি, লেখক ও নাট্যকার।

( নিবন্ধটির লেখক রেজা ঘটক। এটি সামহোয়ারইনব্লগ থেকে পুনঃমুদ্রিত)

মন্তব্য