চিকুনগুনিয়া থেকে শিশু-কিশোরদের বাঁচাতে করণীয়

887

হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া। রোগটি প্রাণঘাতি না হলেও এর আক্রমণ মানুষকে কাবু করে ফেলছে। বিশেষ করে তীব্র জ্বর, মাথা ব্যথা, হাড়ে ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠে। জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা সহজে পিছু ছাড়ে না। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে কারো কারো ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। স্বাভাবিক কারণেই শিশুরা এই জ্বরে আক্রান্ত হলে অনেক বেশি কাবু হয়ে পড়ে। সোনামনিদের কষ্ট প৪্রবল উতলা করে তুলে অভিভাবকদেরকেও। তাই শিশু-কিশোরদেরকে চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে বিশেষ সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

চিকুনগুনিয়া কি

চিকুনগুনিয়া হচ্ছে একটি মশাবাহিত রোগ। একটি বিশেষ ভাইরাস। ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা চিকুনগুনিয়া জ্বরের জীবানুরও বাহক। চিকুনগুনিয়ার জীবানু বহনকারী এডিস মশা কাউকে কামড় দিলে তার শুড়ের মাধ্যমে দেহে চিকুনগুনিয়ার জীবানু প্রবেশ করে। অন্যদিকে সাধারণ এডিস মশা চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত কোনো মানুষের রক্ত পান করলে তার মধ্যে চিকুনগুনিয়ার জীবানু প্রবেশ করে। পরে এই মশা যখন অন্য কাউকে কামড় দেয়, তখন ওই ব্যক্তি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

Chikungunya-In-Children

চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ

চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ হলো জ্বরের তীব্রতা। অল্প সময়ের ব্যবধানে শরীরের তাপমাত্র ১০৩/১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মাথাব্যথা, হাড়ে ব্যথা, চোখের কোটরে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ থাকে।

শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ব্যথার মাত্রা হতে পারে অনেক বেশি। অনেকের ঘন ঘন বমি হয়।

তিন থেকে পাঁচদিনে যখন জ্বর কমতে শুরু করে তখন চুলকানি এবং র‍্যাশ বা লাল লাল দানা দেখা যেতে থাকে।  এই র‍্যাশ দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে অনেকের র‍্যাশ থাকে না। এর পরিবর্তে  কালচে বাদামি বা ধূসর রঙের দানা  থাকে। আবার  বড়দের মতো হাড়ে ব্যথা কম সংখ্যক বাচ্চাদেরই থাকে। তবে যেসব বাচ্চার হাড়ে ব্যথা হয়, তাদের ক্ষেত্রে ব্যথার মাত্রা তীব্র হয়।

রোগ নির্ণয় 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেবল লক্ষণ দেখে এবং সাধারণ কিছু পরীক্ষার সাহায্যে চিকিৎসকরা চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। এ ছাড়া চিকুনগুনিয়া রোগে অ্যান্টিবডি টেস্টও আছে । তবে প্রায় ক্ষেত্রে এটির প্রয়োজন হয় না। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ না করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

চিকিৎসা 

চিকুনগুনিয়া হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে। তবে সাধারণত পর্যাপ্ত পানি, তরল, ডাবের পানি, ফলের জুস ইত্যাদির সঙ্গে বয়স অনুযায়ী পেরাসিটামল খেলে এই রোগ সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। হাড়ে বা জয়েন্টে ব্যথা হলে বরফ লাগিয়ে দিলে ব্যথা কমবে। ব্যথা একটু কমে এলে ফিজিওথেরাপি দেওয়া যাবে। চিকুনগুনিয়া রোগে হাড়ে ব্যথা এক থেকে দুই মাসও থাকতে পারে। তবে দশদিনের বেশি হাড়ে ব্যথা স্থায়ী হলে এবং টেস্ট করে নিশ্চিত হলে যে এটি ডেঙ্গু নয়, সেক্ষেত্রে ব্যথানাশক দেওয়া যেতে পারে।

শিশু-কিশোরদের রক্ষায় সতর্কতা

চিকিৎসার চেয়ে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ বেশি জরুরী। বিশেষ করে ছোট্ট সোনামনি যদি এই জ্বরে আক্রান্ত হয়, তাহলে তার কষ্ট হয়ে উঠবে অবর্ননীয়। অভিভাবক হিসেবে সন্তান/স্বজনের এই কষ্ট সহ্য করা কঠিন। তাই চিকুনগুণিয়া প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার-

  • এডিস মশা সব সময় দিনে কামড়ায়। তাই দিনের বেলায় যাতে মশা কামড় না দিতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
  • ফুলের টব, নাড়কেলের মালা, ফেলে দেওয়া টায়ার ইত্যাদিতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই বাসার ভেতর ও আশপাশ পরিস্কার রাখতে হবে, যাতে পানি জমতে না পারে।
  • বাসার সামনে বা খেলার মাঠে পানি জমে থাকলে সেখানে শিশু-কিশোদের খেলতে যেতে দেওয়া যাবে না।
  • ছোটরা দিনের বেলায় ঘুমালে মশারীর ভেতর ঘুমুতে দেওয়া উচিত হবে।
  • দরজা-জানালা বন্ধ রেখে নির্দিষ্ট সময় পর পর অ্যারোসল বা ওই জাতীয় মশক নিধক ওষুধ স্প্রে করা যেতে পারে।
  • বাচ্চাদের গায়ে ওডোমস বা ওই জাতীয় মলম মাখিয়ে রাখা যেতে পারে, যাতে মশা তাদেরকে কামড় না দেয়।
  • স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ বা কমিউনিটিকে এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে ও মশক রিরোধক ওষুধ ছিটাতে বার বার তাগিদ দিতে হবে।

 

 

মন্তব্য