বাংলা সন যেভাবে এল

21
Nababarsha-1
বাংলা নববর্ষ

পহেলা বৈশাখ। বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে পুরো বাংলা মেতে উঠে উৎসবে। রাজধানী ঢাকাসহ জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলও উচ্ছল-উজ্জ্বল হয়ে উঠে লোকজ মেলা ও নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে।বাংলা নববর্ষ উদযাপন বর্তমানে এ জনপদের সবচেয়ে বড় আর সর্বজনীন উৎসব।

শহুরে মানুষের কাছে বাংলাসন তেন পরিচিত না হলেও আমাদের কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব কাজে কিন্তু এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা সন।

তো এই বাংলা সন কখন কীভাবে চালু হয়েছে তা কি আমরা জানি? না, আমরা অনেকেই এটা জানি না। অবশ্য বিষয়টি সম্পর্কে আমরা কেউই সুস্পষ্টভাবে জানতে পারিনি। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যেও বিতর্ক রয়েছে। এ বিতর্কের মীমাংসাও খুব সহজে হচ্ছে না।

আধুনিক কালের ঐতিহাসিকরা বাংলা সনের ঠিকুজি বের করতে নানা উৎস হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। তবে অকাট্য কোনো তথ্য-প্রমাণ তারা হাজির করতে পারছেন না। মীমাংসা তাই হচ্ছে না। পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকরা যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে পরোক্ষ প্রমাণ ও অনুমানের মাধ্যমে বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে চারজন সম্রাট, রাজা বা সুলতানের নাম সামনে নিয়ে এসেছেন। এঁরা হলেন মোগল সম্রাট আকবর, সুলতান হোসেন শাহ, রাজা শশাঙ্ক এবং তিব্বতি রাজা স্রংসন ( ইনি ৬০০ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে রাজা হন এবং মধ্যভারত ও পূর্ব ভারত জয় করেন)।

এঁদের মধ্যে বেশিরভাগ পণ্ডিত সম্রাট আকবরকে বাংলা সনের প্রবর্তক মনে করেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাদের একজন। এঁদের যুক্তি হল : প্রথমত, সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন হিজরি সন ছিল ৯৬৩ এবং বাংলা সনও ছিল ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। দ্বিতীয়ত, আবুল ফজলের আই্ন-ই-আকবরি গ্রন্থে ইলাহি অব্দ সম্পর্কে লেখা আছে : ‘‘আকবর বহুদিন ধরে হিন্দুস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলে (দিন গণনার) সমস্যাকে সহজ করে দেওয়ার জন্য এক নতুন বছর ও মাস গণনাক্রম প্রবর্তন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি হিজরি অব্দ ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। আমীর ফয়জুল্লাহ শিরাজীর প্রচেষ্টায় এ অব্দের প্রবর্তন হল। ‘তৃতীয়ত, ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দটি আধুনিক। এর ব্যবহার খুব বেশিদিনের নয়। ‘সন’ ও ‘সাল’ শব্দ দুটি আরবি ও ফার্সি। এ থেকে অনুমান করা যায় যে. বাংলা সন বা সালের সঙ্গে কোনো হিন্দু রাজার সম্পর্ক অনুমান করা অবাস্তব। চতুর্তত, নারদীয় পুরাণের উত্তরভাগের একটি পুঁথির তারিখ ‘শক ১৭২৩জ (য) বন নৃপতে শকাব্দ ১২০৮ রত্নপীঠস্য নৃপতে শকাব্দ ২৯৩’ অর্থাৎ শকাব্দের ১৭২৩, যবন নৃপতির শকাব্দ (অর্থাৎ বছর) ১২০৮ (এবং) স্থানীয় অঞ্চলের নৃপতির শকাব্দ (সম্বৎসর) ২৯৩।

Mongol-Shovjatra_5
মঙ্গল শোভাযাত্রা

আলোচ্য পুঁথিতে যবন নৃপতির যে শকাব্দ বা বৎসরের কথা বলা হযেছে তা নিশ্চয়ই বাংলা অব্দ। কারণ এ বছরের (১২০৮) সঙ্গে ৫৯৩-৯৪ যোগ করে যে খ্রিষ্টাব্দ পাওয়া যায় (১৮০১-২), শক বছরটির (১৭২৩) সঙ্গে ৭৮-৭৯ যোগ করে আমরা সেই খ্রিষ্টাব্দই পাই। এ সমীকরণ থেকে বোঝা যায় যে, ১৮০১-২ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ উনিশ শতকের গোড়াতেও বাংলা অব্দের উৎসের সঙ্গে এক যবন নৃপতির সম্পর্কের কথা জনসাধারণের স্মৃতিতে জাগরুক ছিল। অমিতাভ ভট্টাচার্য যুক্তিসঙ্গতভাবেই অনুমান করেছেন যে, মুসলিম বাদশাহ আকবরের পক্ষে এই যবন নৃপতি হওয়া খুবই সম্ভবপর। (বাঙলা সন : ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বঙ্গ, বাঙ্গলা ও ভারত, পৃষ্ঠা ৮০-৮৭)।

পুঁথি গবেষক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য বাংলা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সন-তারিখ সম্পর্কে নানা অনুসন্ধান করেছিলেন। সে জন্য তাকে এ অঞ্চলের সন-তারিখ সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ বলে অভিহিত করা হয়। তিনি তাঁর বিশিষ্ট গবেষণাকর্ম ‘বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয়’ (প্রথম খণ্ড পৃ. ৩৭৮)-এ বলেছেন : ‘‘সুলতান হোসেন শাহের সময়ে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন চালু হয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালিত্বের বিকাশেও শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ও সুলতান হোসেন শাহের অবদান বিরাট। সুলতান হোসেন শাহ নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করতেন। ‘শাহ-এ-বাঙালিয়ান’ বলে নিজের পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি। তাদের একজন, অর্থাৎ হোসেন শাহের পক্ষে বাংলা সন চালু করা অসম্ভব নয়।’’

তবে সুলতানি আমল বিশেষজ্ঞ শ্রী সুখময় মুখোপাধ্যায় এ মত মেনে নিতে পারেননি। তিনি লিখেছেন : ‘‘কোন বিষয় থেকে যতীন্দ্রবাবু এ সিদ্ধান্তে উপনীত হযেছেন তা তিনি উল্লেখ করেননি। সেজন্য একে গ্রহণ করতে আমাদের অসুবিধা আছে।’’ এটা ঠিক যে, কোনো কোনো পুঁথিতে ‘যবন নৃপতে শকাব্দ’ বলা হয়েছে, রামগোপাল দাসের রসকল্পাবলীর পুঁথিতেও বঙ্গাব্দকে ‘যাবনী বৎসর’ বলা হযেছে। কিন্তু এ থেকেই এটা অনুমান করা ঠিক নয় যে, কোনো মুসলমান রাজা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেছিলেন, এবং তিনি হোসেন শাহ।

হোমেন শাহ (রাজত্বকাল ১৪৯৩-১৫১৯) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন এ মতের বিপক্ষে একটি যুক্তি দেখানো হয়। হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহ একটি সংবৎ প্রবর্তন করেছিলেন যা ‘নসরৎশাহী সন’ নামে পরিচিত। বঙ্গাব্দের সঙ্গে এর তফাত দু’বছরের। ১০৮৩ নসরৎশাহ সন এবং ১০৮১ বঙ্গাব্দে লেখা একটি পুঁথি পাওয়া গেছে (যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয়, পৃ. ৩৭৭)। বঙ্গাব্দ যদি হোসেন শাহের দ্বারা প্রবর্তিত হত, তাহলে তাহলে তার পুত্র একটি নতুন সংবৎ প্রবর্তন করতেন কি? (সুধাময় মুখোপাধ্যায়, ১৪০০ সাল, শারদীয় সংখ্যা এক্ষণ, কোলকাতা)।

বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ সিলভাঁ লেভি ফরাসি ভাষায় লেখা ‘লে নেপাল’ (দ্বিতীয় খণ্ড, প্যারিস ১৯০৫) শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন : ‘‘৬০০ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে স্রংসন নামে এক তিব্বতি রাজা মধ্য ও পূর্ব ভারত জয় করেন। তিনিই বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, এবং তার নামের শেষাংশ অনুযায়ী সন শব্দটি রাখা হয়।’’ অবশ্য এ যুক্তি খণ্ডন করে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের বিশিষ্ট পণ্ডিত পদ্মশ্রী ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘‘তিব্বতে ওই সময় কোনো অব্দ প্রচলনের এবং স্রংসনের বাঙলা অঞ্চল আক্রমণের নিশ্চিত প্রমাণ নেই।’’

বঙ্গাব্দ চালু সম্পর্কে আরেকটি প্রধান মতে দাবি করা হয় যে, গৌড়ের সম্রাট শশাঙ্ক বাংলা সনের প্রবর্তক। সুনীল কুমার বন্দোপধ্যায় একটি বইতে এ মত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন : ‘‘৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ সোমবার) বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল, এবং ওই দিনই শশাঙ্ক গৌড়বঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজত্ব শুরু করেছিলেন।’’ ড. অতুল সুরসহ কেউ কেউ এ মত সমর্থন করেছেন। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ব্রতীন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখেছেন : ‘‘এই মতের সপক্ষে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে, শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বা অন্তত ওই সময়ে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছিলেন। এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। যদিও সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগে তাঁর রাজত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আমাদের হাতে আছে।…. শশাঙ্কের রাজত্বের কোনো নথিবদ্ধ তারিখ আমাদের জানা নেই।…’’ ( বাঙ্গালা সন, পৃ. ৮০, বঙ্গ, বাঙ্গালা ও ভারত)

সাহিত্যে ইতিহাসের অনেক উপকরণ বিধৃত থাকে। তাই সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আমরা জানি যে. আগে নববর্ষ শুরু হত অগ্রহায়ণ মাসে। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর বর্ণনায় অগ্রহায়ণ বন্দনা আছে। চক্রবর্তী কবি লিখেছেন : ‘‘অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস; বিফল জনম তার, নাহি যায় চাষ।

এই কতিাংশ থেকে কি এমন ধারণা করা চলে যে, ষোড়শ শতকের আগে বাংলা সন চালু হয়নি? তখন অন্য কোনো ফসলী সন চালু ছিল যা শুরু হত অগ্রহায়ণ মাসে? এ অনুমান সত্য হলে শশাঙ্ক কর্তৃক বাংলা সন প্রবর্তনের প্রশ্নই উঠে না। অষ্টাদশ শতকের কবি ভারতচন্দ্রের বর্ণনায় আমরা অগ্রহায়ণ নয়, বৈশাখের বর্ণনা পাই। ভারত চন্দ্র লিখেছেন: ‘‘বৈশাখ এদেশে বড় সুখের সময়, সোনা ফলে গাছে মন্দ গন্ধবহ হয়।’’ এই বৈশাখ-বন্দনা থেকে ধারণা করা চলে যে, তখন বাংলা সন চালু হয়ে গেছে।

যেভাবে বা যা দ্বারাই চালু হোক, বাঙালির সমাজজীবনে নববর্ষের গুরুত্ব অসামান্য। রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের চিন্তা-চেতনা ও ভাবনার বিকাশে নববর্ষের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাংলা নববর্ষ উৎসব আরও বিকশিত, অর্থপূর্ণ ও তাৎপর্যময় হোক এই আশা করি।

মন্তব্য